Breaking News
Home / আলোচিত খবর / কমলগঞ্জের গায়ক আব্দুর রহমান ভান্ডারীর জীবন ও জীবিকার কথা

কমলগঞ্জের গায়ক আব্দুর রহমান ভান্ডারীর জীবন ও জীবিকার কথা

মাহমুদুল হাসান উজ্জল ।।

কমলগঞ্জের এক অজ পাড়া গায়ে জন্ম গায়ক আব্দুর রহমান ভান্ডারীর । নেই তার কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা । দারিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত পরিবারে সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা ইচ্ছে থাকলেও লেখাপড়া করতে পারেননি ।তার জন্মদাতা পিতা ছিলেন গ্রাম্য ছোট্ট এক মসজিদের মুয়াজ্জিন। তখন কার যুগে একজন মুয়াজ্জিন কতইবা সন্মানী পেতেন । ভান্ডারীর ভাইবোন সহ পরিবারের লোক সংখ্যা ছিল নয়জন। মসজিদের মুয়াজ্জিনগিরী একমাত্র আয়ের উৎস হওয়ার কারণে  এই বেশী সংখ্যক সদস্যের পরিবারকে পরিচালনা করতে গিয়ে হিমসীম খেতে হতো তার পিতাকে।

কিন্তু এই দারিদ্রতা দমিয়ে রাখতে পারেনি আব্দুর রহমানকে।  তিনি থেমে থাকেননি।  দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া মূর্খতাকে ডিঙ্গিয়ে সমাজে নতুন পরিচিতি আনতে হয়। কি করে নিত্য শতশত বাঁধা পাড়ি দিয়ে এই অসাধ্যকে সাধন করতে হয়। তাও আবার  লোকগীতির  একজন গীতিকার ও শিল্পী হিসেবে । আসুন জেনে নেই তার কি করে জয় করলেন এমন কঠিন লয়।

লোক শিল্পী ও লোককবি-মোঃ আব্দুর রহমান (ভান্ডারী)।কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়েন ২নং ওয়ার্ডের রাজার গাও গ্রামে ১৯৬২ সালের ২০ই সেপ্টেম্বর এক মুসলিম দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। আব্দুর রহমান তাঁর মূল নাম হলেও এলাকার সকলের কাছে ভান্ডারী নামেই অতি পরিচিত। গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি দরবার শরীফের পীর সাহেব-সৈয়দ মঈনুদ্দিন আহমেদ আল হাসানী ওয়া আল হোসাইন মাদ্দাজিল্লুহুল আলীর কাছে বয়াত গ্রহণ করেন ২০০৫ সালে। এর পর থেকেই পীর সাহেবের অনুমতিক্রমে তাঁর নামের পেছনে ভান্ডারী সংযুক্ত করা হয়। তিনি ছোট বেলা থেকেই ছিলেন এলোমেলো। বাউল, পীর-মুশির্দী, ভাটিয়ালী জারি-সারি ও দেশাত্মবোধক গান তাঁর খুব প্রিয়। তখনকার সময় প্রখ্যাত সুফি সম্রাট ক্বারী আমীর উদ্দিনের গান তিনি বেশি শুনতেন। এক কথায় আমিরী সংগীতের অন্ধ ভক্ত তিনি। লোকগীতি লেখা কিংবা তাঁর কণ্ঠে গান গাওয়ার অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করতো আমির সাহেবের গান। নিজের বয়সের ১২/১৪ বছর থেকেই ছুটে বেড়াতেন অত্র অঞ্চলের আশপাশের মাজার শরীফের উরশে। মন ভরে গান শুনতেন আর গুনগুন করে গান করতেন। গানের জন্য ছোটবেলায় অনেক বকাঝকা খেয়েছেন- বাবা মা ও প্রতিবেশির কাছে। ছয় ভাই এক বোন মা ও বাবাকে নিয়ে তাঁর বৃহৎ সংসার। বাবা মোহাম্মদ আলীও তেমন লেখাপড়া করতে পারেননি। তবে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলেন। আর ঐ অল্প লেখাপড়ায় কি চাকরীই’বা করা যায়। তিনি ছিলেন অতি ধর্মভীরু । তাঁর ধর্মভীরুতা দেখে এলাকার লোকেরা তাকে মসজিদের মুয়াজ্জিনের কাজ দেন। পাঁচ বেলা মাসজিদে আযানের সম্মানী ও এলাকার দানবীর লোকেদের সাহায্যে সহযোগীতায় চলতো মোহাম্মদ আলীর পরিবার।

ভাই বোনের মধ্যে আব্দুর রহমান দ্বিতীয়। অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ থাকায় -তাকে লেখাপড়া করাতে সক্ষম হননি তার বাবা । ভাই বোন সাতজনের মধ্যে সর্বশেষ ভাইটি বর্তমানে প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। বড় পাঁচ ভাই সমঝদার হলে একের পর এক ভাই সংসারের বোঝা কাঁধে তুলে নেন আর ছোট ভাইটিকে গড়ে তুলেন নিজের মত করে। আব্দুর রহমান জীবনের প্রথমার্ধে জীবিকার প্রয়োজনে কৃষিকাজ ও ১৮বছর পূর্ণ হলে একজন কাঠমিস্ত্রীর যোগানদার হিসেবে ভানুগাছ বাজারে প্রথম কাজে যোগদান করেন। আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলতো তার গান কবিতা পুঁথি ইত্যাদি লেখা ও গাওয়া । লেখাপড়া দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত হওয়ায় তাঁর লেখার বানানে হতো অজস্র ভুল। শব্দ ভুল হলেও থামেননি তিনি। নিত্য কিছু না কিছু লিখেই যাবেন এটাই যেনো ছিল তার পন।  পাশাপাশি হাটে ঘাটে মেলায় উরশে যেখানে গানের জলসার খবর পেতেন সেখানেই সবার আগে ছুটে যেতেন। কাঠ মিস্ত্রীর যোগালীগিরী করতে করতে একসময় তিনি হয়ে উঠেন একজন দক্ষ মিস্ত্রী। কিছুটা বৃদ্ধিপায় তার আয় রোজগার।
২৮বছর বয়সে সহধর্মিণী মোছাঃ রেজিয়া বেগমের সাথে আবদ্ধ হন বিবাহ বন্ধনে । সংসার জীবনে চার ছেলে ও দুই মেয়ের জনক তিনি। সংসার জীবনের প্রথমার্ধে টান পোড়েন আর অভাবের সংসারে ছেলে মেয়েদের অসুখ বিসুখের কারণে দারিদ্রতা তাকে জেকে ধরলে স্ত্রী রেজিয়া তাঁর পাগলামিকে থামিয়ে দিতে বলেন। পাগল কি আর শোনে কথা।

স্ত্রীর কথায় কান না দিয়ে  তিনি চলছেন তার নিজের মত করে। রাতের বেলায় গান বাজনা ও দিনে কাঠমিস্ত্রীর কাজে যা অল্প পয়সা আয় হয় তাতেই চলছে ভান্ডারীর জীবন। নিজ সম্বল বলতে বাবার সম্পত্তিতে ছয় ভাইয়ের মধ্যে ভাগাভাগি করে পেয়েছেন মাত্র ৫ শতক জায়গা । আর ঐ জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে তাঁর মাথা গুজবার ঠাঁই। এভাবে চলতে চলতে বড় ছেলেটা বড় হয়ে উঠলো। কিন্তু বিধি বাম। বড় ছেলেটি মানসিক ভাবে পুরাপুরি সুস্থ নয়। তাই আব্দুর রহমান ইচ্ছে থাকলেও বড় ছেলেকে লেখা পড়া করাতে পারেন নি।
দ্বিতীয় ছেলেটি ডিগ্রী শেষ বর্ষের ছাত্র। তিন নাম্বার ছেলেটি ক্লাস অষ্টম পর্যন্ত লেখাপড়া করে সংসারে ভার নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে। সে এখন তার বাবার সহযোদ্ধা ।  দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে মেট্রিক পাশ করতে পারেননি। সর্বশেষ মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ছে। আর ছোট ছেলেটি কোরান শরীফ হিফজ করছে।

আব্দুর রহমান নিজে মূর্খ হলেও সন্তানদের শিখাচ্ছেন লেখাপড়া। লেখাপড়া কত মূল্যবান তা তিনি আজ বুজতে পারেন। কেননা লিখতে বসলে প্রতিটা লেখার বানান কেউ না কেউ ঠিক করে দিতে হয়। আব্দুর রহমানের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী নিজ এলাকার ছেলে মোঃ রোজেল বখত প্রায়ই তাঁর লেখার বানান ঠিক করে দেন। তাই তিনি ইচ্ছা করছেন ছেলেকে বি সি এস ক্যাডার বানাবেন। তাতেও তাঁর দুঃখ মিটবেনা এই বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এই গুণী কবি লেখার পাশাপাশি গান গেয়েও ইতিমধ্যে বেশ আলোচনায় এসেছেন। যদিও কেউ কেউ প্রথমে তাকে পাত্তা দিতেন না । মানতে চাইতেন না লেখক ও শিল্পী হিসেবে। শত বাঁধা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ তিনি সফলতার পথে। যদিও বয়স ৫৭ এর ঘরে। স্হানীয় প্রশাসন কিংবা আওয়ামীলীগের বিভিন্ন সভা সেমিনারে তিনি গান গেয়ে চলছেন অবিরত এবং তাঁর কথা ও কন্ঠের গানে মুগ্ধ হচ্ছেন সকলে। যাঁর যা খুশিমত বখশিশ দিচ্ছেন তাঁকে।

কমলগঞ্জ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য তিনি । আলাপচারিতায় আব্দুর রহমান জানালেন, কমলগঞ্জের গুণী মানুষের ভালবাসার কাছে তিনি চিরকৃতজ্ঞ। সমাজের নানা নিয়ম অনিয়মকে যখন যেভাবে সাদা কাগজে কলমের কালি দ্বারা আবদ্ধ করছেন, মনের ভাবকে। তাঁর লেখার সংখ্যা লোকগীতি ১৫০টি, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতাকে নিয়ে ২৫টি ও অন্যান্য সবগুলো মিলিয়ে বর্তমানে তিন‘শ এর কাছাকাছি। কঠিন দেশভক্তি তাঁর অন্তরে বিরাজমান। রাজনৈতিক নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধু তার খুবই পছন্দের।

তাঁর ইচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন-আমি আমার লেখাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে ছড়িয়ে দিতে চাই  দেশব্যাপী। কিন্তু আমার কাছে সেই পরিমান টাকা না থাকায় সেটা সম্ভব হয়ে উঠছে না। এ ব্যাপারে তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
তার নিজের লেখা গানগুলোও প্রচার প্রসারের অভাবে আজ ঘরে বন্দী। বাংলাদেশের আনাচে কানাচের সকল লোকশিল্পীদের অনুরোধ করেছেন তার লেখা গানগুলো ভালবেসে গাইবার জন্য।
যদিও বয়স প্রায় শেষের পথে কিন্তু তার  ইচ্ছে শক্তি প্রবল । এই বয়ষেও তিনি স্বপ্ন দেখেন । গান গেয়ে মাতিয়ে দিতে চান গোটাদেশ। আমরা কি পারিনা অদম্য মনোবলের এই শিল্পীকে তার স্বপ্নসাধ পুরণে সহযেগীতার হাত বাড়িয়ে দিতে!

আব্দুর রহমান ভান্ডারীর লেখা  কয়েকটি গান  পাঠকদের উদ্দেশ্যে এখানে উপস্থাপন করা হলো –

উন্নয়নের গান

খোঁজে দেখবো বাংলাদেশে কে করেছে উন্নয়ন
উন্নয়ন বিহনে সুখী কেমনে হবে জনগণ।।

বাংলাদেশের জাতিগোষ্ঠী দেখেছে সুখের স্বপন
ধীরে ধীরে সোনার বাংলা হইতেছে পরিবর্তন
যোগাযোগের সু-ব্যবস্হা খুশিতে আজ ভরামন-ঐ

ভাতা-বৃত্তি যত ইতি,সুশিক্ষা প্রয়োজন
সুস্বাস্থ্য বাসস্থান,শেখ হাসিনার দুই নয়ন
দেশের টাকায় পদ্মাসেতু, দেখছেন দেশের জনগণ -ঐ

ডিজিটাল সোনার বাংলা বিশ্বের দরবারে নামকরণ
মায়ের মত শেখ হাসিনা সবাইকে করছে লালন
রূপপুরে আজ বিদ্যুৎ কেন্দ্র পৌছালেন আলোর কিরণ-ঐ

মানুষের কল্যাণে কে আজ বুঝে গেছে জনগণ
দশ টাকা প্রতি কেজি চাউল করতেছে বিতরণ
পেট ভরে খাবার পাই,হাহাকার নয় এখন-ঐ

দেশের গান

হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো আজ বাঙালীদের স্মৃতি
ভুলা যায়না মানুষের কর্ম আর কীর্তি
আঁধার ছুয়ে আলোকিত দুঃখ অবসান
শেখ মুজিবুর রহমান বীর বাঙালী সন্তান।।

দেখছেন কত দেখবেন কত বঙ্গবন্ধুর শান
৭ই মার্চের ভাষণ কেন্দ্র করলো যানতা খাঁন
নির অস্ত্র বাঙালী মারলো ছাড়িয়া কামান মেশিন গান-ঐ

হাজার হাজার মায়ের কূল খালি করে ছিলো
কেঁদে কেঁদে অবশেষে মা’যে অন্ধ হলো
মায়ের বুকের ব্যাথার অনল কে করবে সমাধান-ঐ

যা দেখিছি তাই লিখেছি সোনার বাংলার শান
ইতিহাস খুঁজলে পাবেন সবকিছুর প্রমাণ
বুর্জ বৃষ্টির মত গুলি বাংলাদেশ ধূলার সমান-ঐ

শেখ হাসিনার ভাব উদ্দেশ আরও সুন্দর করবে দেশ
বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষা হল বিদ্যমান -ঐ

সিলেটের প্রাকৃতিক লীলাভূমি নিয়ে গান

সিলেট আমার জন্মভূমি সিলেট আমি ভালবাসি
মৌলভীবাজার জেলা শাহজালালের পূন্যভূমি
ভুলিয়া থাকতাম কিলা।।

জালালী পরশে সিলেট নিয়ামতে ভরা
জৈন্তায় সুন্দর পান পানি ছাতকের কমলা
জাফলংয়ের পাথর কোয়ারী কুদরতি খেলা-ঐ

সারি ঘাটে বালুর খনি নিয়ামতি লীলা
প্রাকৃতিক পাহাড় সুন্দর হাওর নদী নালা
লাউছড়া মাধবপুর লেক হামহাম কমলগঞ্জ উপজেলা-ঐ

মাধবকুণ্ড ঝরণার পানি সুন্দর ঝরে ধারা
শমশেরনগর বিমান ঘাঁটির বরই আর পেয়ারা
শ্রীমঙ্গলের আনারস খাইতে রস গোল্লা-ঐ

দুনিয়াটা কত সুন্দর যায়না চাইলেই ভুলা
ভুলি ভুলি আব্দুর রহমান শেষ হয়ে যায় বেলা
আজ মরলে কাল দুইদিন পাগল আমার মন উতালা-ঐ

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Check Also

প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা স্কুল ড্রেস, জুতা ও ব্যাগ কেনার টাকা পাবে ১৭ই মার্চ

কমলগঞ্জ বার্তা ডেস্ক ।। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্ম শত বার্ষিকী উপলক্ষে ...