Breaking News
Home / আলোচিত খবর / কমলগঞ্জের সফল কৃষক করিম চারা বিক্রী করে কোটিপতি হওয়ার গল্প- কমলগঞ্জ বার্তা

কমলগঞ্জের সফল কৃষক করিম চারা বিক্রী করে কোটিপতি হওয়ার গল্প- কমলগঞ্জ বার্তা

বিশেষ প্রতিনিধি ।।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার জালালপুর গ্রামের বাসিন্দা এক  সেনা সদস্য  নাম তার এম এ করিম (৫৫)।শান্তিতে জাতিসংঘ পদকপ্রাপ্ত সাবেক এই সেনা সদস্য  ২০০২ সালে কমলগঞ্জ উপজেলা সদরের গোপালনগরে বানিজ্যিক ভিত্তিতে  টমেটো চাষ শুরু করলে তার খামারে উৎপাদনের যে রেশিও ছিল তা গোটা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।তার অদম্য মনোবল তাকে দেশের একজন শ্রেষ্ট কৃষকের গৌরব অর্জনের সুযোগ করে দেয়।একজন সফল কৃষক হিসাবে তিনি জাতীয় কৃষি পুরুষ্কারে ভূষিত হন।২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তিনি তার এ পুরুষ্কার গ্রহণ করেন।

পুরুষ্কার পাওয়ার বিষয়টি তাকে আরও অনুপ্রাণিত করে কৃষিতে ব্যাপকভাবে আত্মনিয়োগে। এরপর থেকে এই উৎসাহকে কাজে লাগিয়ে তিনি আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের বিস্তির্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে তোলেছেন একে একে ৩টি খামার। এক সময় তিনি নিজে একা কাজ করলেও এখন প্রতিদিন দুই শতাধিক কৃষি শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন তার খামারে।

একসময় নিজে অন্যের কাছ থেকে কিনে এনে টমেটোর চাষাবাদ করলেও এখন তিনি তার নিজের খামারে উৎপাদন করছেন চারা । জালালপুর গ্রামস্থনিজের বাড়ীর সন্মুখস্থ ৫ কানি জমির উপর গড়ে তোলা  তার আরিফ হাইব্রিড টমেটো নার্সারী এন্ড প্রোডাক্ট নামের খামারে প্রতিদিন গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত হচ্ছেন শত শত হাইব্রিড টমেটোর চারা।এসব চারা কিনে নিচ্ছেন হবিগঞ্জ, চট্রগ্রাম,ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, নারায়নগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা।এখানে উচ্চ ফলনশীল ২ জাতের চারা উৎপাদিত হচ্ছে । তার মধ্যে ১টি হলো ফ্রান্সের মঙ্গলরাজা এবং অপরটি বাংলাদেশের বারি-৮ । প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার এসব উন্নত জাতের টমেটোর চারা বনবেগুনের সাথে গ্রাফটিং করা হচ্ছে এই খামারে।এসব চারা নিজ জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের আরো আট থেকে দশটি জেলায় সরবরাহ হচ্ছে।অনেকে মৌসুমের আগেই চারার সংখ্যা জানিয়ে অর্ডার দেন। তাদেরকে সময়মতো সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হয় বলে জানালেন তিনি।

‘ড্রাফটিং পদ্ধতিতে ১২ মাসি  টমেটোর চারার একজন সফল  উৎপাদক এম এ করিম জানালেন, প্রতিমাসে শ্রমিক পেমেন্টসহ এই নার্সারীর বিভিন্ন কাজে তার খরছ হয় প্রায় ছয় লক্ষ টাকা ।এ বছর প্রতি চারা ৮ টাকা দরে এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২০ লক্ষ চারা সোয়া কোটি টাকায় বিক্রী করেছেন।তার এ নার্সারী তৈরীর কারণে সেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে গ্রামের ২ শতাধিক বেকার যুবকের।তিনি নিজে তাদের শিখিয়েছেন কিভাবে গ্রাফটিং করতে হয়।১ জন কর্মী প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৮ শত চারা গ্রাফটিং করতে পারেন।

গ্রাফটিং পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এম এ করিম বলেন, বনবেগুন হচ্ছে বেগুনের একটি জংলি জাত, গ্রাম-গঞ্জে এ বেগুনের হরেক নাম। এই বেগুন চারার গোড়ার দিকের অংশের সঙ্গে টমেটোর চারার ওপরের দিকের অংশ জোড়া দিয়ে করা হয় গ্রাফটিং। বনবেগুন গাছের রোগ বালাই নেই বললেই চলে ।এই সাথে পোকা মাকড়ের আক্রমনও কম হয়। তাই বনবেগুনের সাথে গ্রাফটিংকরা চারার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে বেশী। এই পদ্ধতির টমেটোর চারা বড় হয়ে ঢলে পড়ে না। উপরন্ত ফলন মেলে প্রচুর। যেখানে সাধারণ একটি গাছে পাঁচ-দশ কেজি টমেটো মেলে, সেখানে গ্রাফটিং করা প্রতি গাছে মেলে বিশ থেকে পঁচিশ কেজি।আর  আমার এই বারোমাসী টমোটা গাছথেকে বছরে তিনবার ফসল উৎপাদন করা যাবে।জমিতে অন্যান্য ধরণের টমেটো চারার চাষাবাদের মতো কীটনাশকও দিতে হয়না।গ্রাফটিং করা টমেটো গাছ পানি সহনীয়। তাই ভারী বৃষ্টিতেও এই টমেটোগাছ নষ্ট হয় না। চারার দাম একটু বেশী হলেও সমস্যা নেই। এক খরচেই সব হয়ে যায়।আর তাই এ পদ্ধতির চারা চাহিদাই এখন অনেক বেশী। তার উৎপাদিত এই চারা আষাঢ- শ্রাবণ মাসেও রোপন করা যায়। আগাম টমেটো বের করতে পারলে লাভ বেশি। তখন কেজিপ্রতি টমেটো ১০০-১১০ টাকা বিক্রি হয়।

এম এ করিমের উৎসাহে উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামে প্রায় অর্ধশত কৃষক  গ্রাফটিং করা চারা ব্যবহার করে টমেটোর চাষে উদ্যোগীহয়ে গড়ে তোলেছেন টমেটো খামার। এম এ করিম নিজেও এ বছর উপজেলার ধলাই সীমান্তবর্তী এলাকায় চা বাগানের অব্যবহৃত জমি লীজ নিয়ে প্রায় ২১ বিঘা জমিতে গ্রাফটিং পদ্ধতির চারা দিয়ে টমেটোর চাষ করেছেন। ক্ষেতে টমেটোও ধরেছে, এর মধ্যেই টমেটো পাঁকতে শুরু করেছে।

 

‘অসময়ের টমেটো চাষী’ হিসাবে খ্যাত এম এ করিম সম্পর্কে জানতে চাইলে কমলগঞ্জের জালালপুর গ্রামের বাসিন্দা টমেটো চাষী মোতালেব বক্ত বলেন, এম এ করিম সেনা সদস্য ছিলেন। আদতে তিনি একজন উদ্ভাবনী কৃষক। নানা ফসল নিয়ে তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। টমেটোর এই গ্রাফটিং প্রযুক্তি তাঁর কারণে সহজেই এলাকার সাধারণ কৃষকের কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন। নিজে লাভবান হয়ে এলাকার কৃষকদের বিরতিহীনভাবে পরামর্শ দিয়ে চলছেন মানুষটি।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ তাকে সহযোগীতা করছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এম এ করিম একরকম অভিযোগের সুরেই বললেন, উপজেলার কৃষি বিভাগ যদি  আন্তরিক হতো, তাহলে এ উপজেলার মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা কৃষিতে  বিপ্লব ঘটাতে পারতো। তিনি বলেন, ৮০ ভাগ কৃষি নির্ভর এ দেশে  সরকার কৃষকদের যথাযথ মুল্যায়ন করে না, যা খুবই দু:খজনক। অন্যান্য বিভাগে জাতীয় পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় লক্ষ লক্ষ টাকা। আর কৃষিতে দেওয়া হয় ৫-৬ হাজার টাকার পুরস্কার। আর এতে কৃষকরা কৃষিতে ক্রমশ উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে।  তাই অন্যান্য বিভাগের মতো পুরুষ্কারের মান উন্নয়নসহ সরকার যদি কৃষিকে আরো গুরুত্ব দেন, তবে দেশ কৃষিতে আরো এগিয়ে যাবে এমনটাই মনে করেন কৃষক এম এ করিম।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Check Also

কমলগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে পূজামন্ডপে নগদ অর্থ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ-কমলগঞ্জ বার্তা

কমলগঞ্জ বার্তা রিপোর্ট ॥ কমলগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে পৌর এলাকার ব্রাহ্মণ, পুরোহিত ও ৭টি পূজামন্ডপ কমিটিকে ...