Breaking News
Home / আন্তর্জাতিক / নিউ ইয়র্কের প্রবীণ ঝাল-মুড়িওয়ালার পাশে প্রবাসীরা

নিউ ইয়র্কের প্রবীণ ঝাল-মুড়িওয়ালার পাশে প্রবাসীরা

সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশায় সানোয়ার আহমেদ  ২৭ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন বাংলাদেশের মৌলভীবাজার থেকে। শত চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত গ্রিন কার্ড পাননি। তাই অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দিনাতিপাত করছেন গ্রেফতার আর বহিষ্কারের আতঙ্কে।

পেটের দায়ে দান-দক্ষিণায় সাজিয়েছিলেন পান-সুপারি আর ঝাল-মুড়ির দোকান। উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশিদের রাজধানী হিসেবে খ্যাত নিউ ইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে ৭৩ স্ট্রিটে সানোয়ারের এ দোকান সকলেরই দৃষ্টি কাড়ে। সহানুভূতিতে অনেকে ঝাল-মুড়ি কেনেনও।

ওয়ার্ক পারমিট না থাকায় মধ্য বয়সে যেমন প্রত্যাশিত চাকরি পাননি, একইভাবে এই পড়ন্ত বয়সে সে সুযোগও আর নেই। তবু হাল ছাড়েননি। দেশে রেখে আসা স্ত্রী-সন্তানের কথা ভেবে খরতাপ আর হাড় কাঁপানো শীতেও রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝাল-মুড়ি, পান-সুপারি বিক্রি করেন।

সানোয়ার আহমেদের পাশে এটর্নি ম্যাথিউ সারপো

কিন্তু এটাও কারো কারো সহ্য হচ্ছিল না। ওই রাস্তার পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ প্লাজার কোন ব্যবসায়ী ফোন করেন পুলিশকে। সিটির স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মকর্তাসহ পুলিশ এসে কয়েক দফা জরিমানার টিকিট দেয়। হাজার ডলারের জরিমানা পরিশোধ করেন নিকটস্থ আদালতের মাধ্যমে।

এ অবস্থায়ও থেমে থাকেনি সানোয়ারকে রাস্তা থেকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রে লিপ্তরা। কিস্তির অর্থ পরিশোধরত অবস্থায় আবারও হাজার ডলারের টিকিট দেওয়া হয় তাকে। পরপর তিন দফা জরিমানা দিয়ে অতীষ্ঠ হয়ে সানোয়ার আদালতকে সবিস্তারে অবহিত করেন। আদালত বিস্ময় প্রকাশ করলেও স্বাস্থ্য বিভাগ আর পুলিশ বিরত হয়নি। কয়েক মাস আগে তার সেই স্বপ্নের ঝাল-মুড়ির দোকান আটক করে নিয়ে যায়।

সানোয়ারের এমন অসহায় অবস্থায় মাঠে নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা- ‘দেশিজ রাইজিং আপ মুভিং’ তথা ড্রাম। তারা সিটি স্বাস্থ্য দপ্তরে গেলে জানানো হয় যে, নিকটস্থ প্রেসিঙ্কটে নেওয়া হয়েছে দোকানটি। প্রেসিঙ্কটে গেলে পুলিশ জানায় যে সেটি গার্বেজ করা হয়েছে। অথচ ওই দোকানটিই ছিল সানোয়ারের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।

অবশেষে ড্রামের সহায়তায় সানোয়ার মামলা করেছেন নিউ ইয়র্ক সিটির বিরুদ্ধে। তার সাথে নির্দয় ও নিষ্ঠুর আচরণের এ মামলায় সামিল হবেন আরও অনেক ‘স্ট্রিট ভ্যান্ডর’। কারণ নিউ ইয়র্কের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা পুলিশের সহায়তায় তার মতো স্ট্রিট ভ্যান্ডরদের সাথে যে আচরণ করেছেন, তা সভ্যতার পরিপন্থি এবং নাগরিক অধিকারের লংঘন।

ঝাল-মুড়ির দোকানে সানোয়ার আহমেদের একটি ছবি

সানোয়ার এসব তথ্য উপস্থাপন করেন সোমবার জ্যাকসন হাইটসে ড্রাম অফিসে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে। তিনি বলেন, “এর আগে আরও তিন বার আমাকে হাজার ডলারের টিকিট দেয়। প্রথমবারের টিকিটের জরিমানা কয়েক কিস্তিতে পরিশোধের পরই আরেকটি দেয়। সেটিও কিস্তিতে পরিশোধ করছিলাম। তেমনি অবস্থায় আরেকটি টিকিট দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। এ দুটি টিকিট হাতে দেখে মাননীয় আদালত বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।”

সানোয়ার বলেন, “আমি এমন নিষ্ঠুর আচরণের বিচার চাই। এ সময় পাশে এসেছে ড্রাম। আবার দোকান সাজিয়ে দিয়েছেন। স্ট্রিট ভ্যান্ডরদের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে সোচ্চার ‘আরবান জাস্টিস সেন্টার’-এ যাবার পর ব্রুকলিনের আরেকজন আইসক্রিম বিক্রেতা মহিলার একই অবস্থার কথা জেনেছি। সেই মহিলা এবং আমি বাদি হয়ে মামলা করেছি। আরও যারা ভিকটিম রয়েছেন, তারাও পরবর্তীতে এ মামলায় সামিল হবেন।”

‘আরবান জাস্টিস সেন্টার’-এর এটর্নি ম্যাথিউ সারপো বলেন, “জীবিকার জন্যে স্ট্রিট ভ্যান্ডররা রাস্তায় অস্থায়ী দোকান সাজিয়েছেন। এটি তাদের মানবিক অধিকার। এজন্যে স্বাস্থ্য বিভাগ এমন বর্বর আচরণ করতে পারে না, যা পেটে লাথি দেওয়ার মত হয়। আমরা এহেন আচরণ বন্ধের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ দাবিতে মামলা করতে বাধ্য হয়েছি। ভবিষ্যতে আর কোন স্ট্রিট ভ্যান্ডর যাতে এমন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন না হন, সেটি বন্ধের জন্যে মামলার বিকল্প ছিল না।”

এ সময় ড্রামের স্বেচ্ছাসেবীরা সমস্বরে স্লোগান দেন, “ওয়ার্কার্স রাইটস আর হিউম্যান রাইটস”, “হোয়েন ভ্যান্ডর্স আর আন্ডার অ্যাটাক-হোয়াট ডু উই ডু-স্ট্যান্ড আপ ফাইট ব্যাক”, “মোর পারমিট-নো পুলিশ” ইত্যাদি।

নিউ ইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে ৭৩ স্ট্রিট বাংলাদেশিদের দখলে। সে কারণেই এই স্ট্রিটেরই বাংলাদেশ প্লাজার সামনে ঝাল-মুড়ি, পান-সুপারির দোকান বসিয়েছিলেন সানোয়ার। কে বা কারা তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতলবে মাঝে মধ্যেই পুলিশ ডাকতে থাকেন।

একইভাবে ৭৩ ও ৭৪ স্ট্রিটের মাঝে ৩৭ এভিনিউর ওপরেও সাজানো ধর্মীয় বই ও পোশাকাদির দোকানের বিরুদ্ধে পুলিশ ডাকাডাকির ঘটনা ঘটেছিল। স্ট্রিট ভ্যান্ডরদের মানবাধিকার লংঘনের এসব আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ইতোপূর্বে ড্রামের পক্ষ থেকে মিছিল-সমাবেশ করা হয়েছে।

জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশি বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের সাথেও এ নিয়ে মানবিক একটি সমঝোতা তৈরি হয়েছে। এরপরেও সানোয়ারের মত একজন বৃদ্ধকে স্ট্রিট থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের ঘটনায় প্রবাসীরাও ক্ষুব্ধ।

সানোয়ার বলেন, “দেশে স্ত্রী-সন্তানদের টাকা পাঠাতে পারছি না কয়েক মাস যাবত। ছেলেটি লেখাপড়া অব্যাহত রাখতে পারছে না। আমি সকলের সহায়তা চাই। এ আহ্বানে সাড়া দিয়েই ড্রামের পরিচালক কাজী ফৌজিয়ার চেষ্টায় আরেকটি দোকান বসিয়েছেন সানোয়ার।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Check Also

১৭২ বছর পর বিশ্ব দেখবে বিরল এক সূর্যগ্রহণ

অনলাইন ডেস্ক ::  আগামী ২৬ ডিসেম্বর বছরের শেষ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। বছরের শেষ সূর্যগ্রহণ দেখতে ...