Breaking News
Home / জাতীয় / মৌলভীবাজার পাসপোর্ট অফিসে দালাল দৌরাত্ম্য : টাকা না দিলে ভোগান্তি-কমলগঞ্জ বার্তা

মৌলভীবাজার পাসপোর্ট অফিসে দালাল দৌরাত্ম্য : টাকা না দিলে ভোগান্তি-কমলগঞ্জ বার্তা

স্টাফ রিপোর্টার॥ মৌলভীবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের প্রধান ফটকের বাহিরে দেখা গেল ভিন্ন এক ইশারা। সকাল ১১ টার দিকে প্রধান ফটকের বিপরিতে একটি চায়ের দোকানানের সম্মুখে কয়েকজন গণমাধ্যকর্মী ৪ অক্টোবর দাঁড়ান। ওই সময় দেখা যায় এক দালাল দ্রুত গতিতে বেশ কয়েকটি পাসপোর্ট ও কাগজপত্র নিয়ে ভেতেরে প্রবেশ করতে চান। এসময় প্রবেশ গেইটে থাকা আনসার সদস্য শামিম গণমাধ্যকর্মী দেখিয়ে ইশারা দিলে ওই দালাল ভেতরে প্রবেশ না করে পশ্চিম দিকে মাথা নিচু করে চলে যান। আশপাশে কিছু সময় অবস্থানকালে দেখা যায় ইশারা-ইঙ্গিতের এমন কিছু দৃশ্য। দালালদের খপ্পরে যেন পুরো পাসপোর্ট অফিসটিই। দালাল না ধরলে পাসপোর্ট পেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। দালালদের টাকা ও তাদের মাধ্যমে না গেলে শত চেষ্টা করেও যথাসময়ে পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ নেই।
প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজার পাসপোট অফিসে নানা অনিয়ম সহ চলছে দালালদের দৌরাত্ম্য। যে কারণে প্রতিদিন পাসপোর্টের কাজে আসা মানুষ পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। দ্রুত সেবা পেতে হলে নির্ধারিত ট্রাভেলস এজেন্সি ও ভ্রাম্যমান দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট আবেদন জমা দিতে হয়। পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন আবেদন জমা ও পাসপোর্ট গ্রহন করতে আছেন চার থেকে পাঁচশত মানুষ। দীর্ঘ লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে অনেকেই আবেদন জমা দিতে পারছেননা। আবার অনেকেই আবেদন জমা দেয়ার পর সময়মতো পাসপোর্ট হাতে না পেয়ে বার বার ধর্না দিচ্ছেন পাসপোট অফিসে। তবে ট্রাভেলস এজন্সেী ও ভ্রাম্যমান দালাল মাধ্যমে বাড়তি টাকা দিলে পাসপোর্ট সহজে মেলে।

অভিযোগ রয়েছে পাসপোর্ট করার জন্য সব কিছু নিজে করে নিয়ে গেলে অফিসের কর্মচারী ও নিরাপত্তাকর্মী আনসার এই ভুল, সেই ভুল ধরে হয়রানি করেন। কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী বাড়তি আয়ের লোভে দালালদের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলেও সেবাপ্রার্থীরা অভিযোগ তুলেছেন।
দীর্ঘ দিন থেকে পাসপোর্ট অফিসে গড়ে ওঠেছে শক্ত একটি সিন্ডিকেট। পাসপোর্টের জন্য ব্যাংক ড্রাফট এর টাকা ব্যাতিত প্রতি পাসপোর্টে বাড়তি তিন থেকে চার হাজার টাকা নিচ্ছে দালাল সিন্ডিকেট।
পাসপোর্ট করতে আসা লোকদের সার্বিক পরামর্শ বা দিক নির্দেশনার জন্য অফিস এলাকায় দৃশ্যমানস্থানে নেই কোনো হেল্প ডেস্ক। সকাল থেকে লাইনে দাড়িঁয়েও মিলেনা সেবা। ১০ টা থেকে ২টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় ওদের অফিস কার্যক্রম। আর সহযোগিতার জায়গায় উল্টো সবারই ব্যবহার কর্কশ।
পাসপোর্ট করতে আসা রাজনগর উপজেলার কদমহাটা এলাকার মোঃ সামাদ মিয়া জানান, পাসপোর্ট করার জন্য সরাসরি আবেদন জমা দেন। একমাসের অধিক সময় হয়েছে এখনও এসএমএস আসেনি। সরাসরি আবেদন করাটা তার ঠিক হয়নি। দালাল মাধ্যমে দিলে পাসপোর্ট হতে পেয়ে যেতেন।
কুলাউড়ার তাওহিদুল ইসলাম জানান, জরুরী পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন একটি ট্রাভেল্স এজেন্সির মাধ্যমে। মোট ১২ হাজার টাকা দিয়েছেন, ব্যাংক জমা রশিদে ৮০৫০ টাকা লিখা রয়েছে। অতিরিক্ত টাকা দিয়েও সময়মতো পাসপোর্ট পাচ্ছেননা। বিদেশে যাবেন, ভিছার মেয়াদ চলে যাচ্ছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে একাধিক সেবাগ্রহীতার।
অভিযোগ করেছেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার এম আহাদ ফেরদৌস, অনলাইনে পাসপোর্টের অবেদন সরকার সহজ করেছে। কিন্তু আবেদন সরাসরি দালাল ছাড়া জমা দিতে আসলে বিরম্বনায় পড়তে হয়। কোন কথা না বলে এক সপ্তাহপর জমার তারিখ দেয়া হয়। যারা দালাল ধরে আসছে তাদের তাৎক্ষনিক আবেদন জমা নেয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও নিজেদের নাম দস্তখত ভালোভাবে না জানলেও ওরা পাসপোর্ট ডেলিভারী, আবেদন,কাগজপত্র যাচাই বাচাইয়েরও কাজ করছেন। এতে অন্তহীন দূর্ভোগ আর বিড়ম্বনায় আমাদের পড়তে হচ্ছে। প্রতিনিয়তই সেবাগ্রহীতারা এমন হয়রানী আর চরম বিড়ম্বনায় পড়লেও তা থেকে উত্তরণে কোনো স্থায়ী সমাধান নেই।
সদর উপজেলার এক স্কুল শিক্ষক বলেন, পাসপোর্ট কার্যক্রমে দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধে এজেন্ট নিয়োগ দেয়ার যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে এতে করে সেবা গ্রহনকারীরা আরও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হবেন। এধরেনের সিদ্ধান্ত নিলে দালালরা বৈধতা পেয়ে যাবে। তিনি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যক্রমের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ওখানে যেকোন কার্যক্রম করতে গেলে তাদের নিবন্ধিত ইলেকট্রিশিয়ানের মাধমে যেতে হয়। তারা ইচ্ছেমাফিক টাকা নেয় ও গ্রাহক ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। অফিসে গেলে কর্মকর্তারা ইলেকট্রিশিয়ানের যোগাযোগের কথা বলেন।
তিনি পাসপোর্ট এর ক্ষেত্রে এজেন্ট নিয়োগ না দেয়ার দাবীর করেন।
এছাড়া মোক্তাদির হোসেন, বড়লেখার সালাম আহমদ সাজু, হোসনা বেগম, রাজনগরের মো: সামছু মিয়া,মনসুর কোয়েল, কুলউড়ার সেলিম আহমদ, কমলগঞ্জের শাহবাজ আলী, জুড়ীর সেলিম আহমদ সহ অনেকেই জানান নিরাপত্তা সদস্যসহ অফিসের অনেক অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি এই বাণিজ্যে জড়িত। তারা জানান আমরা বৈধ্য ভাবে কাগজপত্র জমা দিয়ে পাসপোর্ট পাইনা। অথচ দালাল কিংবা কোন ট্রাভেলস ব্যবসায়ী একদিনেই অনেক গুলো করতে পারেন। সময়মত পাসপোর্টও পান।
মৌলভীবাজার পাসপোর্ট অফিসে সুত্রে জানা যায় প্রতিদিন এই অফিসে ১শ টি আবেদন গ্রহণের ক্যাপাসিটি থাকলেও জমা নেওয়া হচ্ছে ২৫০টি। আর ডেলিভারী দেওয়া হচ্ছে ২৫০-৩০০টি। যা প্রবাসী অধ্যুষিত এজেলাবাসীর চাহিদানুযায়ী খুবই কম।
গেল ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৫৯৮ টি আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। আর ঢাকা থেকে পাসপোর্ট প্রস্তুত হয়ে এসেছে ২১৬৪টি। তাছাড়া এই অফিসে ৮জন কর্মকর্তার মধ্যে আছেন মাত্র ৫ জন। কমপক্ষে প্রয়োজন আরও ৬ জন। এই ঘাটতি পূরণে সহায়তা দিচ্ছে নিরাপত্তাকর্মী (আনসার) ও পিয়নরা।
মৌলভীবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মোঃ ইউসুফ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন কোন দালালকে তার অফিস এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হয়না। এনআইডি ও পূর্বের পাসপোর্টের তথ্যে মিল না থাকলে যাচাই বাচাই করতে কিছুটা বিলম্ব হয়। এছাড়া রয়েছে জনবল সংকট। তিনি গ্রাহকদের আরও সচেতন হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন যার তার সাথে লেনদেন করবেনা। দালালদের সাথে লেনদেন করলে ক্ষতি আপনাদেরই।
সরকার সেবার মান সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌছে দেয়ার লক্ষে নানা উদ্যেগ নিয়েছে। তবে কিছু অসাধু কর্মচারী,কর্মকর্তা ও দালালদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেনা। ভুক্তভুগিদের মনে করেন দালাল ও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিলে সঠিক সেবা দেয়া সম্ভব।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Check Also

কমলগঞ্জে শেখ রাসেলের ৫৮ তম জন্মদিন উপলক্ষে আলোচনা সভা ও পুরুষ্কার বিতরনী অনুষ্ঠিত-কমলগঞ্জ বার্তা

আমিনুল ইসলাম হিমেল ॥ নানান আয়োজনে ও যথাযথ মর্যাদায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে শেখ রাসেল এর ৫৮ তম ...