Breaking News
Home / জাতীয় / ইতিহাসের মুসলিম মহানায়ক মজলুম খলিফা সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ (রহ.)

ইতিহাসের মুসলিম মহানায়ক মজলুম খলিফা সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ (রহ.)

খালিদ সাইফুল্লাহ্ ॥

ইসলামের হাজার বছরের ইতিহাসে স্বর্ণালী যুগ হিসেবে খ্যাত খেলাফতের শাসনকাল মুসলিম জাতির হৃদয়ে চির অমর ও চির ভাস্বর হয়ে আছে। খোলাফায়ে রাশিদাদের খেলাফতের বিলুপ্তির পর সেখান থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে প্রধানত উমাইয়া, আব্বাসীয় ও ওসমানীয় খেলাফত নামক তিনটি খেলাফাত ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ইসলামের ইতিহাসে ১২৮৮ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ওসমানীয় খেলাফত ব্যবস্থার ৬৩৬ বছরের শাসনকালের মধ্য দিয়ে মুসলিম বিশ্বে খেলাফতীয় শাসন ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক ইতি ঘটলেও মূলত ১৯০৯ সালে মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক, সর্বোচ্চ নির্ধারক, ওসমানীয় খেলাফতের ৩৪ তম অধিপতি, ঐক্য, ন্যায় ও আস্থার প্রতীক এবং আমিরুল মুমিনিন, খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন, কায়সার ই রোম ও সর্বশেষ স্বাধীন খলিফা সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ (রহ.) এর ৩৩ বছরের শাসনকালের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের পতনের সাথেসাথেই খেলাফাতের ইতি ঘটে।

ওসমানীয় খেলাফতের ৩৪ তম খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের জন্ম ২১ সেপ্টেম্বর ১৮৪২ সালে ইস্তাম্বুলে। তাঁর পিতা প্রথম আবদুল মজিদ ও মাতা তিরিমুজগান কাদিন। তিনি জন্মের ১০ বছর পর মাকে হারিয়ে সৎ মা’র কাছে পরম মমতায় লালিত পালিত হন। অত্যন্ত পরহেজগার, বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এই বিদুষী নারীর জীবনদর্শন তাঁর জীবনে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে তিনি খলিফা হওয়ার পর তাঁকে রাজমাতার মর্যাদা প্রদান করেন । তিনি ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তর পড়াশোনার পাশাপাশি আধুনিক ও পাশ্চাত্য শিক্ষার উপর প্রচুর জ্ঞানার্জন করেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় বিচরণ করে নিজেকে সুশিক্ষিত ও সুরুচিশীল হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি খুবই খোদাভীরু, দয়ালু, তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন, মিতব্যয়ী, স্বল্পভাষী এবং ন্যায়- নীতিবান, সৎ চরিত্রবান, একনিষ্ঠ সত্যসাধক, দৃঢ়চেতা ও সুদক্ষ শাসক ছিলেন।

তিনি ১৮৭৬ সালে ওসমানীয় খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণকালে ওসমানীয় খেলাফত চরম বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিল। এদিকে খেলাফত ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য ইহুদি খ্রিষ্টান শক্তিগুলো উঠেপড়ে লেগেছিল। তারা জানতো, খেলাফত ব্যবস্থা নির্মূল ব্যতীত মুসলিম জাতির ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরানো অসম্ভব। তাই তারা উনবিংশ শতকের শেষদিকে মিহদাত পাশার নেতৃত্বে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও আদর্শে উজ্জীবিত একদল তরুণদের নিয়ে ইয়াং তুর্কস নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল খেলাফতের বিলুপ্তির অংশ হিসেবে খলিফা পদের সকল ক্ষমতা হ্রাস করে এটিকে একটি সাংবিধানিক পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ ১৮৭৬ সালে ইয়াং তুর্কসের চাপে পড়ে মিহদাদ পাশাকে উজিরে আজম নিযুক্ত করেন এবং একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করেন। কিন্তু তাঁদের সেচ্ছাচারিতা কারণে ওসমানী খেলাফত হুমকির মুখে পড়লে খলিফা মিহদাদ পাশাকে বহিষ্কার করে ইয়াং তুর্কসের উপর কঠোর নীতি আরোপ করেন।

স্যালোনিকায় আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রোগ্রেস ১৯০৮ সালে ইয়াং তুর্কসের সাথে ঐক্য গড়ে তুলে খেলাফতের বিরুদ্ধে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে একধরনের যুদ্ধ ঘোষণা করে। বিচক্ষণ খলিফা তাদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে শাসনতন্ত্র মেনে নেন। কিন্তু কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রোগ্রেসের দৌরাত্ম চরমমাত্রায় বেড়ে গেলে সাধারণ জনগণ তাঁদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তখন ১৯০৯ সালে স্যালোনিকায় সংগঠিত আনোয়ার পাশার নেতৃত্বাধীন কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রোগ্রেস সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশের সমর্থন নিয়ে খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ পরিচালনার মাধ্যমে খলিফার বিশ্বস্ত বাহিনীকে হটিয়ে খলিফা সুলতান আব্দুল হামিদকে পদচ্যুত করে এবং প্রথমে স্যালোনিকোয় নির্বাসিত করলেও পরে ইস্তাবুলে এনে বায়লারবি প্রাসাদে গৃহবন্দি অবস্থায় রাখে। ১৯১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় ৭৬ বছর বয়সে ফজরের নামাজের সময় আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন তিনি। ইস্তাম্বুলে সুলতান আহমদ সমাধিতে সমাহিত করা হয় মুসলিম বিশ্বের এই মহনায়ককে।

তিনি খেলাফাতের দায়িত্ব গ্রহণের পর ঋণে জর্জরিত ওসমানীয় খেলাফতের ঋণ পরিশোধের দিকে মনযোগ দেন এবং খলিফা অবস্থায় ৯০ শতাংশ ঋণ পরিশোধ করতে সমর্থ হন। বন্যাকবলিত মক্কা ও মদিনায় পানি সেচ প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সংস্কার সাধনের উদ্যোগ নেন এবং দুটি ফান্ড গঠন করেন। যাতায়াত ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ইস্তাম্বুল থেকে ফিলিস্তিন হয়ে মক্কা পৌছানোর জন্য হেজাজে রেললাইন স্থাপনের যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। টেলিগ্রাম ও রেলপথের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন, ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি আইন, প্রকৌশল, ব্যবসায়, মানবিক বিদ্যা, কৃষিশিক্ষার প্রসারের জন্য দেশের সর্বত্র প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও সামরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। দারুল ফুনুন নামে তিনি একটি উচ্চাঙ্গের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয় নামে খ্যাতি অর্জন করে।

বিচক্ষণ খলিফা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, খেলাফত ব্যবস্থা রক্ষার জন্য ইহুদী-খ্রিষ্টানদের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র রুখে দিতে ইসলামী ঐক্য ও চেতনা ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই খলিফা প্যান ইসলামিজম বা বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের প্রচেষ্টা শুরু করেন। বিভিন্ন অঞ্চলের ইসলামি ব্যক্তিত্ব ও প্রায় চল্লিশ হাজার সুফী দরবেশদেরকে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য চেতনা জাগ্রত করানোর বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করেন।

ইহুদি শক্তি ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময় ছাড়াও যে কোনো কিছুর বিনিময়ে ফিলিস্তিনের ভূখন্ডে একটুকরো জমির দাবি জানালে খলিফা সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ তাঁদের উদ্দেশ্যে যে সাহসী বাণী উচ্চারণ করেন তা মুসলিম জাতিকে প্রেরণা যোগাবে হাজার বছর “অভদ্র ইহুদিদের জানিয়ে দাও, ঋণ উসমানীয় খিলাফতের জন্য লজ্জার কোন ব্যাপার নয়। ফ্রান্সের মতো দেশেরও ঋণ আছে, এতে তারা ক্ষতিগ্রস্থ নয়। হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) যে ভূমি জয় করেন তা গোটা মুসলিম বিশ্বের সম্পদ। ইহুদিদের কাছে ফিলিস্তিনের ভূমি বিক্রি করে ইতিহাসে ঘৃণিত এবং জনগণ কর্তৃক প্রদত্ত দায়িত্বের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। ইহুদিদের বিপুল অর্থ থাকতে পারে কিন্তু শত্রুর অর্থ দিয়ে তৈরি প্রমোদ প্রাসাদে উসমানয়িরা লুকাতে পারে না।”

একই বছর জায়নবাদের নেতা Theodor Hertzl পুনরায় জেরুজালেম এসে সুলতানের সাক্ষাত কামনা করেন কিন্তু সুলতান সাক্ষাৎ প্রদানে রাজি হননি। সুলতান তাঁর প্রধান উজিরের মাধ্যমে তাদের কাছে নিম্নোক্ত বার্তা পাঠান, Theodor Hertzl–কে পরামর্শ দিন, “এ পরিকল্পনা নিয়ে যেন আর অগ্রসর না হয়। আমি এক মুষ্টি মাটিও তাঁদের দেব না, যেহেতু আমি এর মালিক নই। এটা বিশ্ব মুসলিমের সম্পদ। মুসলমানরা ফিলিস্তিনের জন্য যুদ্ধ করেন এবং বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এ পবিত্র ভূমিকে রঞ্জিত করেন। ইহুদিদের কোটি কোটি টাকা থাকতে পারে। কোন দিন যদি ইসলামী খিলাফত ধ্বংস হয়ে যায় সেদিন তারা বিনা পয়সায় ফিলিস্তিন দখল করতে পারবে। কিন্তু আমি যতদিন বেঁচে থাকবো আমি আমার বুক তলোয়ারে বিদ্ধ হওয়া পছন্দ করবো তবুও ফিলিস্তিনের ভূমি ইহুদিদের হাতে থাক সেটা মানবো না। আমি জীবিত থাকতে আমার দেহের অঙ্গকে বিচ্ছিন্ন হতে দেবো না।”(লন্ডন পোস্ট, ৬ সেপ্টেম্বর’১৪)। অতঃপর ইতালি সুলতানকে হুমকি প্রদান করে বলে- আপনাকে প্রাণ ও ক্ষমতা দিয়ে এর মাশুল গুনতে হবে।

নব্য তুর্কিদের তাত্ত্বিক ও দার্শনিক কবি রেজা তাওফিক পরবর্তীতে নিজের ভুল বুঝতে পারে ও সুলতানকে উদ্দেশ্য করে লিখে,“ হে মহান সুলতান, ইতিহাস যখন আপনাকে স্মরণ করবে সত্য আপনার পক্ষেই থাকবে/ আমরা নির্লজ্জভাবে আপনার উপর অপবাদ চাপিয়েছি/ অথচ আপনি ছিলেন আমাদের যুগের শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ/ আমরা বলতাম সুলতান জালেম, সুলতান পাগল, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অপরিহার্য/ শয়তান যা যা বলেছিল আমরা সব বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম/ আমরা ঘুমন্ত ফেতনাগুলোকে জাগিয়ে তুলতাম/ কিন্তু হে আমার মুনিব, আপনি পাগল ছিলেন না/ পাগল ছিলাম আমরা কিন্তু আমরা তা বুঝতেও পারিনি/ না শুধু পাগলই নই; বরং আমরা মানুষ্য চরিত্রও হারিয়ে ফেলেছিলাম/ আমরা আপনার উপর নির্লজ্জভাবে অপবাদ চাপিয়েছি।” তার সম্পর্কে প্রখ্যাত লেখক ও দামেশক বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাঈদ আফগানি (রাহঃ) বলেন:“আল্লাহ সুলতান আব্দুল হামিদের উপর রহম করুন। তার সমস্তরের কোন উজির ও সাহায্যকারী তিনি পাননি। তার যুগ গত হয়ে গেছে। অসাধারণ যোগ্যতা ও বিপুল কর্মশক্তি এবং রাজনৈতিক দূরদর্শীতা ও সুগভীর কূটনৈতিক প্রজ্ঞার বদৌলতে প্রায় একক প্রচেষ্টায় তিন দশক কাল তিনি খেলাফতের পতন ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। যদি যোগ্য সঙ্গি ও উপযুক্ত সাহায্যকারী পেতেন, তবে খেলাফতকে আবার প্রথম যুগের প্রতাপও শক্তিময় অবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন।”

মুসলিম বিশ্বের উম্মাহ দরদী সর্বশেষ স্বাধীন খলিফা সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ বিশ্ব মুসলিম জাতির ভাগ্যাকাশে নেমে আসা ঘন-কালো অন্ধকারের ছায়া দূরীভূতকরণের লক্ষ্যে প্রাণপণ লড়াই করেছিলেন জীবনের শেষ অবধি। বারবার হত্যার চেষ্টার সম্মূখীন হয়েও ইহুদি-খ্রিস্টান ও স্বগোত্রীয়দের মিথ্যা প্রপাগাণ্ডা, উপুর্যুপরি ষড়যন্ত্র রুখে দিতে ঈমানের পথে পাথরের মতো অবিচল থেকে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মজলুম খলিফা সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ (রহ.)। আল্লাহ তাঁকে জান্নাত দান করুন আমীন।

লেখকঃ খালিদ সাইফুল্লাহ্
এলএলবি (অনার্স), এলএলএম
কবি ও লেখক
১৩-০৫-২০২০

তথ্যসূত্রঃ
১. উসমানীয় খেলাফতের ইতিকথা
-এ কে এম নাজির আহমদ
২. Website: Sultan of the Ottoman Empire
৩. ইতিহাসের এক মজলুম খলীফা সুলতান
দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ (রহ.)-হুমায়ুন বিন হারিস
৪. তুরস্কের খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ (রহ):
যিনি ইহুদীদের ফিলিস্তিনের ভূমি দিতে
অস্বীকার জানান-ডঃ আ.ফ.ম. খালিদ হোসেন

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Check Also

প্রথমবারের মতো বিমানসেনা হলেন ৬৪ নারী-কমলগঞ্জ বার্তা

আমিনুল ইসলাম হিমেল ॥ বিমানবাহিনীর ৪৮তম নব বিমানসেনা দলের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ- সমকাল বিমানবাহিনীর ৪৮তম নব ...